Slideshow Image 1 Slideshow Image 2 Slideshow Image 3 Slideshow Image 4 Slideshow Image 5 Slideshow Image 6 Slideshow Image 7 Slideshow Image 8 Slideshow Image 9 Slideshow Image 10
Blog Details
My Blog

21 September 18

সময় এক অলীক ‘বাইসাইকেল’

সময় এক অলীক বাইসাইকেল

শহর তখন এক উড়ুক্কু মনখারাপ। বেগতিক কার্নিশে সারাদিন জমে থাকে ময়লা রঙের মেঘ। এর হাত থেকে পরিত্রাণ চাইলে একটা হালকা গলি বেয়ে বেরিয়ে আসতে হয়। চার-চিমনির একটা ইলেক্ট্রিক-সাপ্লাইয়ের কারখানার উপরের আকাশে পাক খাচ্ছে একটা জলজ্যান্ত শুয়োর। উইশ ইউ আর হিয়ার। তুমি যদি থাকতে সেই শহর আর সেই সময়ে...! আমার হৃদপিণ্ডে ওই কারখানা থেকে ডিরেক্ট ঝাঁকি মারছে ছ’হাজার ভোল্ট বিদ্যুৎ। গলির পরে আরও গলি... বড় রাস্তা... হাইওয়ে...! সেটা পেরলে প্রান্তর। অ্যাক্যুস্টিক গিটারে ঝিম ঝিম। ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’ থেকে কখন বাঁক বদলে ‘লেড জেপেলিন’, ‘জেথ্রো টাল’, ‘স্করপিয়নস’। রকের হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কখনো কান্ট্রি— ডেনভার, ড্যান সিলস, ডন উইলিয়ামস। কখনও বা  সাইমন-গারফাঙ্কেল। ‘ভেনচারস’ আর ক্লিফ রিচার্ডের জগৎ পেরিয়ে বি.বি.কিং, আর্মস্ট্রং। ডিকেন্স পার হয়ে নিজেরই অজান্তে কখন যেন কাফকা আর কাম্যুর ধূসর বিষণ্নতায় মশগুল। কে যেন পেরেক পুঁতে দিচ্ছে নার্ভে। এক এক মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে তামাম ছবি-ছক্কা। ওষুধের দোকান থেকে ট্যাবলেটের অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল লম্বা হয়ে নামছে। গিলে খাচ্ছেন গোদার, কুরোসোওয়া, বার্গম্যান। মোৎসার্ট থেকে এক জার্কে  সস্ট্যাকভিচ, স্ট্রাভিনস্কি। নতুন করে সাউন্ড বসছে নির্বাক ছবির পিছনে। সস্ট্যাকভিচের সিম্ফনি ধমনির গহীন থেকে তুলে আনছে ব্যাটলশিপ পোটেমকিন।   

এ সবের আগেই দেখা হয়ে গিয়েছিল ছবিটা। সরলা মেমরিয়াল হল-এ। পর্দার ও পাশ থেকে ছুটে এসেছিল ঝাঁক ঝাঁক বাইসাইকেল। বাইসাইকেল—তোলপাড় হয়ে যাওয়া প্রেম। তুবড়ে যাওয়া মুখ। দে সিকা-র ছবির সাইকেল হঠাৎ সালভাদোর দালির ‘সেন্টিমেন্টাল কলোকি’ ছবির ক্যানভাস। একটা পেল্লায় পিয়ানোকে ঘিরে ঘুরে চলেছে বাইসাইকেলের ঝাঁক, তার আরোহীরা যেন এ জগতের কেউ নয়। আমার কষ্টটা কোথায়? প্রথম প্রেগনেন্সি? কীসের বেড়ে ওঠা শিরার ভেতর? রক্তে বিষ মিশে আছে প্রিয়তমা! এখন সময় যায়... কখন যে যায়, কোথায় যে যায়...! হঠাৎ গলি পেরতে গেলে ষাট পয়সা ঘণ্টা। ক্রিং ক্রিং শব্দ আর বাংলাদেশী পাতি দু-চাক্কা। কখন ঘুরতে ঘুরতে ইতালির চোরা গলি। হ্যান্ডেল ধরে থামিয়ে দিলেন দে সিকা। সরলা মেমরিয়াল। সরল মেমরি লেন। সেটা তো ব্যাপক জিনিস!স সত্যজিৎও টাল সামলাতে পারেননি। বাইসাইকেল থিভস। আমার গোপন ক্যালাইডোস্কোপ।   

আজও খুব কষ্ট হলে শাওয়ারের নিচে চোখ বন্ধ করে এক লহমায় দেখে ফেলি সেই ‘বাইসাইকেল’। আমার গানের প্রথম উচ্চারণ, আমার প্রথম গিটার, প্রথম ‘জ্যাম-ইন’। প্রথম সারারাত জাগা। রিহার্সাল। চড়া সুদে টাকা ধার করা সাউথ এন্ড গেস্টহাউসের মালিক রঞ্জিৎ বোসের কাছ থেকে। ঝুনো লোক। আমাকে দিয়ে একটা পাতি যাত্রার সুরও করিয়ে নিয়েছিল বিনা পয়সায়। সুদও নিয়েছে, দুধও খেয়েছে। তবে রিহার্সালের জন্য ঘর ভাড়া দিয়েছিল বটে। ওই যাত্রার সুবাদেই। বালিগঞ্জ স্টেশন রোড। যাত্রার ঘরেই রিহার্সাল হত। ব্যান্ড লাইন-আপ—মধুদা, মধু মুখোপাধ্যায় বেস-এ, ‘হেল ফায়ার’-এর রাণাদা লিড ভোক্যাল, আমি  গিটার, ভায়োলিন, হারমোনিকা আর লিরিক-এ, সুরও আমার, ড্রামস-এ মলয়, কখনও কখনও বেস গিটারে বেণু, ‘হেল ফায়ার’-এর সুভাষ মণ্ডল ছিল অর্গ্যানে আর ভোক্যালে ছিল দেবযানী। রেকর্ডিংটা হয়েছিল সাউন্ড উইং স্টুডিও-য়। সে এক দাস্তান! কী সব চিজ ছিল! টাকা যে কখন ফুরুৎ, কে জানে! আবার ধার। আজ যত সহজে কম্প্রোমাইজ করতে পারি, তখন পারতাম না। ক্যাপিটাল বলতে ছিল ধুন্ধুমার পাগলামো আর সীমাহীন জেদ।

পুরো অনুপ্রেরণাটাই গৌতমদার। তার সঙ্গে তখনও আমার সাক্ষাৎ আলাপ নেই। অবশ্য এটাও সত্যি যে, মহীনের এমন কোনও শো হয়নি, যেটা আমি দেখতে যাইনি। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম, কী ওলট-পালট কাণ্ড করে লোকগুলো! আর একটা হাত, একটাই মাত্র হাত স্ট্রিং পুল করে, আর ঘোড়ারা নাচে, গান গায়, আকাশে ঝুলে থাকা লালচে, পানসে চাঁদের দিকে গ্রীবা বাড়িয়ে গেয়ে ওঠে ডেকাডেন্সের দিপ দিপ টিউন। মহীনের কর্মকাণ্ডের সবকিছু আমাকে এতটাই টেনেছিল যে, কলকাতায় প্রথম পা-রাখা অপুর মতো আমি গিলছিলাম শুধু। সামনে গিয়ে আলাপ করতে পারিনি। পাঠক প্রশ্ন তুলতে পারেন, ‘বাইসাইকেল’-এর গল্প করতে বসে এই সব সাতকাহন কেন। এর উত্তরটা স্মৃতিরেখার মতোই জটিল। অত সহজে সেই উত্তরে আসা যাবে না।

গান হয়ে গেলে রিহার্সাল, রিহার্সাল হয়ে গেলে বাজনা— এমনটা ঘটেছে বহু, বহু দিন। অন্য দিকে আমি কিন্তু তখন তুমুল প্রফেশনাল, সত্যজিৎ-সলিল— এঁদের  সঙ্গে কাজ করছি। সেই সব সামলে আবার ‘বাইসাইকেল’,  আবার রিহার্সাল-রেকর্ডিং। বার বার গান, বার বার মুছে দেওয়া ক্যাসেটের ফিতে। দেবযানী কোথায় তুমি? গজল গাওয়া মেয়ে... তোমাকে দিয়ে ‘যায় যাক, যাক না’ গানটার হারমনি করিয়েছিলাম...।

একটু তলিয়ে ভাবলে ব্যাপারটাকে কেমন স্বাভবিক বলে মনে হয় না। এক মধ্যবিত্ত বাপ। ‘মধ্যবিত্ত’, কিন্তু জিনিয়াস। তের-চোদ্দ বছর বয়সে আমাকে একটা নেশাখোর গ্রুপে গিটার শিখতে পাঠিয়ে দিল। ‘হেল ফায়ার’-এর কিংশুক দত্ত। তাদের আদরে-স্নেহে-প্রশ্রয়ে কীসব যেন ঘটে গেল। বাবাকে জানতাম ইউরোপিয়ান মিউজিকের লোক হিসেবেই। ধ্রুপদ-সাধক। বাখ-বিথোভেন-আবদুল করিম খাঁ। কিন্তু সেই সবের সঙ্গে তাঁকে কন্টেম্পোরারিও টানছিল। আমার গিটার শেখার ব্যাপারে তিনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে সাহস করেছিলেন। ভাবা যায় না! ‘হেল ফায়ার’-এর ঠেক-এ আমি আবার তাদের মাস্টারমশাই হলাম। তাদের ওয়েস্টার্ন স্কোর শেখানোর দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। ‘হেল ফায়ার’-এই অন্য সাউন্ডের সঙ্গে পরিচয়। মহীনের খবর পেয়েছিলাম তাদেরই ডেরায়।

সরাসরি চলে আসি ‘বাইসাইকেল’-এ। আজ মনে আছে কি ঠিক ক’টা গান হয়েছিল? সম্ভবত ন’টা। বহুদিন ধরে হয়েছিল। টাকা ধার। ফুরিয়ে গেলে আবার টাকা ধার। স্টুডিও-র মালিক ছিল বেজায় নির্দয়।  ধার-বাকিতে এক্কেবারেই নারাজ। আজকে যদি আমার স্টুডিও ‘লাইভ রুম’-এ একটা নতুন ব্যান্ড কাজ করতে চায়, শর্তহীন থেকে যেতে রাজি আছে এ বান্দা। চা-কফি-স্ন্যাক্স আর স্টুডিও ভাড়া? সেটুকু সামলে নেবো। নতুনের কোনও ঠিক-ভুল বলে কিছু হয় না। তার একটাই পরিচয়— সে নতুন। যেমন ‘বাইসাইকেল’, যা রেকর্ড হয়েছিল ‘নগর ফিলোমেল’-এর কিছু আগেই। রেকর্ডিং-এ নন্দদা গিটার-সিন্থেসাইজার নিয়ে এসেছিল। শহরে প্রথম। আমরা হাঁ করে দেখেছি। সুজনের গলায় ‘ভেসে আসে কোলাহল, ভেঙে যায় ঘুম’ এখনও বহু সময় আমায় রাত তিন ঘটিকা-চার ঘটিকায় ঝটকা মেরে তুলে দেয়। ‘ভিউয়িং গ্যালারি থেকে রুমাল উড়িয়ে কারা বিদায় জানায়/ আত্মীয়জন-বন্ধুস্বজন— ওরা কেউ নয়/ তবু রুমাল ওড়ায়’। পাঠক, আপনাকে জানাই, সেই ১৯৮০ সালে এয়ারপোর্টে ‘ভিউয়িং গ্যালারি’ বলে একটা বস্তু ছিল। যেখান থেকে আমরা আমাদের বিদেশগামী কাকা-মামাদের উদ্দেশ্যে রুমাল ওড়াতাম। তৃতীয় বিশ্বের রুমাল উড়তো আকাশে ওপারে আকাশে কী আছে আর কী নেই, তার উদ্দেশ্যে। বিমান উড়ে যেত। কোথায়, আমরা জানি না। দৃষ্টিরেখার বাইরে চলে যেত বিমান। আমাদের হাতের রুমাল তখনও উড়ছে...। ‘যায় যাক, যাক না’ গানটায় একটা অদ্ভুত কাণ্ড করেছিলাম। লিরিকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম একটা জিবেরিশ— ‘ইন্দ্রে মাপাইয়া-ইন্দ্রে গিলাপো- ডিমালাপ উনো- মাপো মাত্রাইয়া’। বহু-বহু আগে ব্যবহৃত হয়েছে এ সব।

করুণ এক মিউজিক রিলিজ।  এগিয়ে এলেন বিমল নাগ। তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তিনিই মাস্টারটা ছাড়িয়ে আনলেন। সে সব আন-মিক্সড। গলে হেজে গিয়েছে বহু বহু বছর আগেই। তবে প্রাপ্তিটা ছিল হিরের খনি আবিষ্কারের মতো। ‘মহীন চাটুজ্যে’, মানে গৌতমদা সেই অ্যালবাম শুনেই ছুটে এসেছিল সাউথ এন্ড গেস্ট হাউসে। শুরু  হয়ে গিয়েছিল ট্রাম-ডিপোর আড্ডা। গেস্ট হাউসের ঘরে গৌতমদা ‘বাইসাইকেল’-এর সবক’টা গানই গেয়ে দিয়েছিল গিটার বাজিয়ে। বস্‌, সন্তানকে নিয়ে যখন পথে নেমেছি, তখন তুমি বাপের মতো, প্রকৃত সাচ্চা বাপের মতো হাত ধরেছিলে এসে। বলেছিলে, তিন প্রহরের বিল তোকে ঠিক দেখাবো আমি। গেস্ট হাউসের ঘরের জ্যামিতি, আমার হাড়-পাঁজর তোমার খুরে দন্ডবৎ দেয়।    

গৌতমদা আর পুটুদি (মিনতি চট্টোপাধ্যায়) ছিল আমার ‘বাইসাইকেল’-এর প্রথম ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ‘বছর কুড়ি পরে’-র রেকর্ডিং-এ আমিই ছিলাম গৌতমদার প্রধান সহযোগী। সেই সময় ‘বাইসাইকেল’-এর আমারই মতন নতুন সব ছেলেরা এসেছে তাদের নতুন সব গান নিয়ে। মাইক-এ তারা প্রায় নতুন। মাল্টিট্র্যাক-এ কী করে তাদের তরতাজা লাবডুব  ধরে রাখা যায় এবং একই সঙ্গে একটা চোরা দক্ষতা দিয়ে তাদের প্রহরীর মত পাহারা দেওয়া যায়, সেই দায়িত্ব ছিল আমার। সবগুলো গান একসঙ্গে রেকর্ডিং হয়েছিল। সব রিলিজ হয়নি একসঙ্গে। ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ প্রোজেক্ট-এ আমার নিজের লেখা ও সুরের গান ছিল ‘আমার দক্ষিণ খোলা জানলায়’। গৌতমদা প্রথম অ্যালবামেই সেই গানটা রাখতে চেয়েছিল। আমার মত ছিল, নতুনদের জায়গা হোক আগে। শেষ পর্যন্ত  সেই গান ঠাঁই পায় ‘মায়া’ অ্যালবামে। সেই গানে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়েছিল গৌতমদা। ব্যব

>
about
My Blog

Debojyoti Mishra

Welcome to the musical world of composer Debojyoti Mishra.

 

<..

contact
My Blog

Debojyoti Mishra

11/1, Lovelock Place, Kolkata - 700019

Mobile : +91 9830059081

E Mail : debojyotimishra2@gmail.com